রাষ্ট্রায়ত্ত ঔষধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এসেনসিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেড (ইডিসিএল) বিগত এক বছরে দক্ষ ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। উৎপাদন বৃদ্ধি, অপচয় রোধ, সিন্ডিকেট ভাঙা এবং আধুনিকায়নের ফলে প্রতিষ্ঠানটি এখন লাভজনক ও টেকসই উৎপাদন কাঠামোর দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে।
ইডিসিএল-এর উৎপাদন ব্যবস্থায় প্রতিদিন মেশিন পরিচালনার সময় পূর্বের তুলনায় অতিরিক্ত ৩০ মিনিট বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে দৈনিক প্রায় ১ হাজার ২৬১ কর্মঘন্টা এবং বছরে ৩ লাখ ১০ হাজারের বেশি কর্মঘন্টা বৃদ্ধি পেয়েছে। এই সময় ব্যবস্থাপনার ফলে বছরে প্রায় ৪৬ কোটি ৫৫ লক্ষ টাকার সমপরিমাণ আর্থিক সাশ্রয় সম্ভব হয়েছে। একই সঙ্গে দৈনন্দিন কাজ নির্ধারিত অফিস সময়ের মধ্যেই সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে, যা সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা বাড়িয়েছে।
কর্মঘন্টা বৃদ্ধি ও দক্ষতা উন্নয়নের কারণে ওভারটাইম ব্যয়েও বড় ধরনের সাশ্রয় এসেছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ছয় মাসে পূর্ববর্তী ছয় মাসের তুলনায় ওভারটাইম বাবদ ব্যয় কমেছে প্রায় ৪ কোটি ১৩ লক্ষ টাকা। ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের মতে, ল্যাগ টাইম কমিয়ে কার্যকর কর্মঘন্টা নিশ্চিত করাই এই সাফল্যের মূল কারণ।
অতিরিক্ত ও অদক্ষ জনবল কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েও ইডিসিএল উৎপাদন বৃদ্ধিতে সফল হয়েছে। অতিরিক্ত জনবল কমানো সত্ত্বেও ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে ঔষধ উৎপাদনের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ৫৯ কোটি টাকা। এর ফলে বেতন ও ভাতা বাবদ সাশ্রয় হয়েছে প্রায় ২৪ কোটি টাকা, যা প্রতিষ্ঠানটিকে আর্থিক সংকট থেকে রক্ষা করেছে।
নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ায় টোল ম্যানুফ্যাকচারিং নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে টোল ম্যানুফ্যাকচারিং বাবদ ব্যয় কমানো সম্ভব হয়েছে প্রায় ৩০ কোটি ৬৭ লক্ষ টাকা। আগে যেখানে ৩৩টি আইটেম টোল ম্যানুফ্যাকচারিং করা হতো, বর্তমানে তা কমে ১২টিতে নেমে এসেছে। পর্যায়ক্রমে নতুন মেশিন ও যন্ত্রপাতি সংযোজনের মাধ্যমে টোল ম্যানুফ্যাকচারিং পুরোপুরি বন্ধ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
গোপালগঞ্জ প্রকল্পে নতুন করে কন্ট্রাসেপটিভ পিল ও স্যালাইন উৎপাদন শুরু হওয়ায় ইডিসিএল-এর উৎপাদন পরিধি আরও বিস্তৃত হয়েছে। পাশাপাশি গোপালগঞ্জের তৃতীয় প্রকল্পে আইভি ফ্লুইড উৎপাদনের জন্য মেশিন ট্রায়াল চলমান রয়েছে। কিছু কারিগরি জটিলতার কারণে একটি কন্ট্রোল প্যানেল মেরামতের জন্য চীনে পাঠানো হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আশা করছে শিগগিরই আইভি ফ্লুইড উৎপাদন পূর্ণাঙ্গভাবে শুরু হবে।
ক্রয় প্রক্রিয়ায় দীর্ঘদিনের সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়ায় ইডিসিএল উল্লেখযোগ্য আর্থিক সুবিধা অর্জন করেছে। বর্তমানে টেন্ডারে অধিক সংখ্যক দরদাতা প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে অংশগ্রহণ করায় কাঁচামাল, মোড়ক সামগ্রী ও যন্ত্রপাতি আগের তুলনায় অনেক কম দামে ক্রয় করা সম্ভব হচ্ছে। এর ফলে ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে ক্রয় খাতে প্রায় ২৬ কোটি ৬৮ লক্ষ টাকার সাশ্রয় হয়েছে।
মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখানে ভ্যাক্সিন প্রকল্প স্থাপনের কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। প্রকল্পটি সম্পন্ন হলে দেশের ভ্যাক্সিন চাহিদা পূরণ করেও বিদেশে রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি হবে। একই এলাকায় এফডিএ গাইডলাইন অনুযায়ী স্টেট অব দ্য আর্ট সরকারি ফার্মাসিউটিক্যাল প্ল্যান্ট স্থাপনের কাজও চলমান রয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মানের ঔষধ উৎপাদনে সহায়ক হবে।
ঢাকা কারখানার পাশে ৬৭ দশমিক ১০৯ ডেসিমেল জমিতে বহুতল ভবন নির্মাণের মাধ্যমে c-GMP মান উন্নয়ন এবং উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে ভাড়াকৃত গোডাউন ব্যয় কমে বছরে প্রায় ১৩ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কর্মীদের মধ্যে কাজের প্রতি আগ্রহ ও দায়িত্ববোধ বাড়াতে মোটিভেশন ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। এর ফলে পূর্বে কর্মবিমুখ থাকা শ্রমশক্তিও এখন নিয়মিত ও দায়িত্বশীলভাবে কাজে অংশ নিচ্ছে।
সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে ইডিসিএল ফাউন্ডেশন ও ইডিসিএল মেডিক্যাল ফাউন্ডেশন গঠন করা হয়েছে। এসব ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মেধাবী সন্তানদের শিক্ষা সহায়তা এবং জটিল ও দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত কর্মীদের চিকিৎসা সহায়তা প্রদান করা হবে।
ইতোমধ্যে ৩৩টি গুরুত্বপূর্ণ ঔষধের মূল্য ক্ষেত্রভেদে ১০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো হয়েছে। আরও শতাধিক ঔষধের মূল্য পুনর্মূল্যায়নের কাজ চলমান রয়েছে। বর্তমানে ইডিসিএল সরকারি হাসপাতালগুলোর প্রায় ৮০ শতাংশ ঔষধের চাহিদা পূরণ করছে। ভবিষ্যতে মুন্সীগঞ্জে ৩০ একর জায়গায় নতুন কারখানা স্থাপনের মাধ্যমে শতভাগ সরকারি চাহিদা পূরণ এবং ঔষধ, ভ্যাক্সিন ও অ্যান্টি-ভেনম রপ্তানির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, স্বচ্ছতা, দক্ষতা ও আধুনিক ব্যবস্থাপনার এই অগ্রযাত্রা ইডিসিএল-কে দেশের স্বাস্থ্যখাতে একটি শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠানে পরিণত করবে এবং সাধারণ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে মানসম্মত ঔষধ নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বিগত সরকারের অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনায় নিমজ্জিত ইডিসিএলে ইতোমধ্যে পরিবর্তনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে। অদূর ভবিষ্যতে দেশের সরকারি ওষুধের চাহিদার পুরোটাই উৎপাদন ও সরবরাহ করতে সক্ষম হবে এই প্রতিষ্ঠানটি।
এসেনসিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেডের (ইডিসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো.সামাদ মৃধা জানান,রাষ্ট্রীয় ওষুধ খাতে এক সময়ের স্থবির প্রতিষ্ঠান এসেনসিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেড আজ সফলতার পথে। ইতোমধ্যে ইডিসিএল লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। দক্ষ ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছ ক্রয়নীতি ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে বইছে পরিবর্তনের হাওয়া। দেশীয় ওষুধ খাতের এই রূপান্তর এখন নতুন করে-আশার আলো দেখাচ্ছে। ইডিসিএল হয়ে উঠছে সুশাসনের উদাহরণ। মাত্র প্রায় এক বছরে চোখে পড়ার মতো সাফল্য অর্জন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। কর্মঘণ্টা বৃদ্ধি, ওভারটাইম ব্যয় হ্রাস, অদক্ষ জনবল কমানো ও উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি এখন নতুন উদ্যমে এগিয়ে চলছে।’
নিজস্ব প্রতিবেদক : 









