দেশে অসংক্রামক রোগের ভয়াবহ বিস্তারের পেছনে অন্যতম বড় কারণ তামাক। প্রতিবছর তামাকজনিত রোগে প্রায় ২ লাখ মানুষ অকালে মারা যাচ্ছেন—দৈনিক গড়ে ৫৪৬ জন। দেশের মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশ যেখানে অসংক্রামক রোগে, সেখানে তামাক নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া এ মৃত্যুর মিছিল থামানো সম্ভব নয় বলে সতর্ক করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।
তিনি বলেছেন, “কার্যকর তামাক নিয়ন্ত্রণ ব্যতীত অসংক্রামক রোগের প্রতিরোধ সম্ভব নয়।” জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় তামাকপণ্যের ব্যবহার কমানোর পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মকে নিকোটিনের আসক্তি থেকে রক্ষায় কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
সোমবার বিকেলে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ঢাকা আহছানিয়া মিশন আয়োজিত ‘অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ এবং তামাক ও নিকোটিনের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুরক্ষায় করণীয়’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে বর্তমান সরকার জাতীয় বাজেটে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দিয়েছে। কিন্তু তামাক স্বাস্থ্য উন্নয়নের অন্যতম প্রধান অন্তরায়। তামাক নিয়ন্ত্রণে সরকার অত্যন্ত সচেতন এবং এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে যাচ্ছে।
তিনি জানান, নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন অধিকতর সংশোধন ও শক্তিশালী করে ২০২৬ সালে পাস করা হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোল (এফসিটিসি) অনুসারে তামাক নিয়ন্ত্রণে আরও সমন্বিত, কার্যকর ও সময়োপযোগী উদ্যোগ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
৩ কোটি ৭৮ লাখ মানুষ তামাক ব্যবহারকারী
সেমিনারে উপস্থাপিত তথ্যে বলা হয়, দেশে প্রায় ৩ কোটি ৭৮ লাখ মানুষ তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার করেন। তামাকজনিত রোগে বছরে প্রায় ২ লাখ মানুষের অকালমৃত্যুর পাশাপাশি স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতির আর্থিক বোঝা প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা।
বক্তারা বলেন, তামাকের ক্ষতি কেবল মানুষের শরীরেই সীমাবদ্ধ নয়। তামাক চাষের কারণে বন উজাড়, মাটির উর্বরতা হ্রাস এবং অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহারে পরিবেশের ওপরও তৈরি হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব।
নতুন প্রজন্মকে টার্গেট করছে নিকোটিন বাণিজ্য
সংশোধিত তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন-২০২৬-এ ই-সিগারেট অন্তর্ভুক্ত না থাকায় সেমিনারে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন বক্তারা। তাদের অভিযোগ, তামাক কোম্পানিগুলো নানা কৌশলে তরুণ ও নতুন প্রজন্মকে লক্ষ্য করে নিকোটিনজাত পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ করছে।
তারা বলেন, প্রচলিত তামাকপণ্যের পাশাপাশি ই-সিগারেট ও নতুন ধরনের নিকোটিনজাত পণ্যের সহজলভ্যতা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নতুন স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। তাই ই-সিগারেটসহ নতুন নিকোটিনজাত পণ্যের উৎপাদন, আমদানি, বিপণন ও বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার দাবি জানান তারা।
একই সঙ্গে এসব পণ্যের প্রচার বন্ধ, বাজারে সহজলভ্যতা রোধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা এবং সংশোধিত তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন-২০২৬-এর আলোকে দ্রুত বিধিমালা প্রণয়নের দাবি ওঠে সেমিনারে।
তামাক নিয়ন্ত্রণেই স্বাস্থ্য সুরক্ষার বড় লড়াই
বক্তারা বলেন, অসংক্রামক রোগের চিকিৎসায় বিপুল অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি তামাকের কারণে প্রতি বছর যে বিপুলসংখ্যক মানুষের অকালমৃত্যু হচ্ছে, তা দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। ফলে তামাক নিয়ন্ত্রণকে শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিষয় হিসেবে না দেখে জাতীয় জনস্বাস্থ্য ও উন্নয়নের অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
ঢাকা আহছানিয়া মিশনের সভাপতি অধ্যাপক ড. গোলাম রহমানের সভাপতিত্বে সেমিনারে প্রধান আলোচক ছিলেন বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল অনকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সৈয়দ মো. আকরাম হোসেন।
আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব শেখ মোমেনা মনি, বিসিআইসির সাবেক চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান এবং ঢাকা আহছানিয়া মিশনের সহ-সভাপতি এস এম ড. খলিলুর রহমান।
স্বাগত বক্তব্য দেন ঢাকা আহছানিয়া মিশনের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সেক্টরের পরিচালক ইকবাল মাসুদ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রকল্প সমন্বয়কারী শরিফুল ইসলাম।
সেমিনারে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা, চিকিৎসক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শতাধিক শিক্ষার্থী অংশ নেন।
এই সংস্করণে “তামাকের ছোবলে বছরে ২ লাখ অকালমৃত্যু”-কে মূল ব্যানার হেডলাইন করে প্রথম পাতার লিডের মতো তথ্যনির্ভর কিন্তু আক্রমণাত্মক সংবাদ-টোন রাখা হয়েছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা | 












